বুধবার ২৪ জুন ২০২৬ - ১১:৪২
মহররম: জাগরণ, সমাজসংস্কার ও মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের মাস

ইরানের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও বক্তা হুজ্জাতুল ইসলাম মাহদী পানাহি বলেছেন, মহররম কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণ কিংবা শোক পালনের উপলক্ষ নয়; বরং এটি মুসলিম উম্মাহর জাগরণ, সমাজসংস্কার এবং মানবিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবনের এক অনন্য শিক্ষালয়। আশুরার বার্তা যেন কেবল আবেগ ও আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যক্তি ও সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে হাওজা নিউজ এজেন্সি’র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা যে তিনি আমাদের আবারও হুসাইনি মজলিস, শোকানুষ্ঠান ও জ্ঞানচর্চার এই মহিমান্বিত পরিবেশে অংশগ্রহণের তাওফিক দান করেছেন। এই সময় শুধু শোক প্রকাশের নয়; বরং আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি, জাগরণ, সংস্কার এবং সত্যের পথে ফিরে আসারও এক মূল্যবান সুযোগ।

মহররম: একটি শিক্ষামূলক ও সভ্যতাগত আন্দোলন
তিনি বলেন, মহররম ইসলামী বর্ষপঞ্জির একটি সাধারণ মাস নয়; এটি ভালোবাসা ও চেতনা, ঈমান ও আত্মত্যাগ, রক্ত ও বার্তার এক মহিমান্বিত মিলনক্ষেত্র। এই মাসে ইসলামের ইতিহাস এমন এক সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়, যেখানে সত্য ও মিথ্যা, স্বাধীনতা ও পরাধীনতা, আলো ও অন্ধকার মুখোমুখি অবস্থান করে।

তার ভাষায়, ইমাম হুসাইন (আ.) ক্ষমতা বা শাসন লাভের উদ্দেশ্যে নয়; বরং মহানবী (সা.)-এর দ্বীনের পুনর্জাগরণ, মুসলিম উম্মাহর সংস্কার এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে আন্দোলনে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কারবালার ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সত্য ও ন্যায় রক্ষার জন্য কখনো কখনো বড় মূল্য দিতে হয়, আর সেই ত্যাগ হতে হবে সচেতনতা, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে।

আশুরা: দ্বীনের বিকৃতি ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক
তিনি বলেন, মহররমের মূল তাৎপর্য এখানেই যে এটি মুসলিম উম্মাহর জাগরণের মাস। ইমাম হুসাইন (আ.) এমন এক প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যা ধর্মকে ক্ষমতার হাতিয়ার এবং বিকৃতি ও দুর্নীতির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

তার মতে, ইয়াজিদ কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন এক বিপথগামী চিন্তাধারার প্রতীক, যার ভিত্তি ছিল সত্যের বিকৃতি, দুর্নীতি এবং ন্যায়ের প্রতি দায়িত্বহীনতা। কারবালার শিক্ষা হলো—একজন মুসলমান কখনো জুলুমের সামনে নীরব থাকতে পারে না এবং সাময়িক স্বার্থের বিনিময়ে সত্যকে বিসর্জন দিতে পারে না।

মহররমের শিক্ষা জীবনাচরণে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি
হুজ্জাতুল ইসলাম পানাহি বলেন, মহররম একটি নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার বিদ্যালয়। আত্মত্যাগ, বিশ্বস্ততা, ধৈর্য, দূরদর্শিতা, সাহস এবং দায়িত্ববোধ—এসব মহৎ গুণ আশুরার মাদরাসায় শিক্ষা দেওয়া হয়। যদি এসব শিক্ষা কেবল আবেগ ও শোকানুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং ব্যক্তি ও সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত না হয়, তবে আমরা মহররমের প্রকৃত বার্তা থেকে দূরে সরে যাব।

তিনি আরও বলেন, আশুরা কেবল শাহাদাত ও বেদনার ইতিহাস নয়; এটি মর্যাদাপূর্ণ, পবিত্র ও আল্লাহভীরু জীবন প্রতিষ্ঠার এক চিরন্তন আন্দোলন। ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা মানবজাতিকে শিখিয়েছেন যে, সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও নীতি ও মূল্যবোধের ওপর অটল থাকা সম্ভব।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর অনুসরণ শুধু শোক পালনে সীমাবদ্ধ নয়
তিনি বলেন, আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা ও শোক প্রকাশ নিঃসন্দেহে মূল্যবান; তবে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর অনুসরণ কেবল অশ্রু ও শোকানুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

পরিবারে হুসাইনি নৈতিকতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা, সমাজে দায়িত্ববোধ, জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ইবাদতে একনিষ্ঠতা এবং বিপদের মুখে ধৈর্য ও দৃঢ়তা—এসবই কারবালার আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন।

আজকের সমাজে আশুরার বার্তার প্রয়োজনীয়তা
তিনি বলেন, মহররম হলো গাফিলতি থেকে জাগরণে এবং আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে সত্যকেন্দ্রিকতার পথে ফিরে আসার সুযোগ। বর্তমান বিশ্বে আশুরার শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে ধারণ করার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

যে সমাজ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শ থেকে শিক্ষা নেবে, সেখানে মানবিক মর্যাদা সুরক্ষিত হবে, অন্যায় ও অধিকারহরণ কমবে, পারিবারিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে এবং ন্যায়বিচার ও সামাজিক দায়িত্ববোধের চেতনা বিকশিত হবে।

মহররম: সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার নবায়নের সময়
তিনি বলেন, মহররম কেবল শোকের সময় নয়; এটি সত্য, ন্যায়, নৈতিকতা, মানবতা, সালাত প্রতিষ্ঠা এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শ অনুসরণের অঙ্গীকার পুনর্নবায়নের সময়।

শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, মুসলিম উম্মাহ আশুরার শিক্ষা থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাবে এবং প্রকৃত অর্থে হুসাইনি আদর্শের অনুসারী হতে সক্ষম হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha